Skip to main content

ত্বক ও চুলের যত্নে আলুর গুনাগুন ও উপকারিতা

আলু অতিপরিচিত এবং প্রচলিত খাদ্য। এটি কন্দজাতীয় এক প্রকারের সবজি, যা মাটির নিচে জন্মে থাকে। এর আদি উৎস দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ, সেখান থেকে ১৬শ শতকে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চ পুষ্টিমান এবং সহজে ফলানো ও সংরক্ষণ করা যায় বলে এটি বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রচলিত সবজিগুলোর মধ্যে অন্যতম। আলু যে শুধু ভর্তা-ভাজি কিংবা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়ার জন্য, তা কিন্তু নয়। চুলের ও ত্বকের যত্নেও অনেক উপকারি এই পুষ্টিকর সবজিটি। ত্বক ও চুলের যত্নে আলু খুব ভালো কাজ করে থাকে।
আলুতে র‍্য়েছে ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, পটশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস এবং জিঙ্ক। এই সকল উপাদান প্রাকৃতিক ব্লিচিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের ত্বকের উপরিভাগের রঙ হালকা করে, কালো দাগ দূর করতে তো এর তুলনা নেই এবং ত্বকে একটা সুন্দর উজ্জ্বলতা ভাব এনে দেয়। আলুর কিছু প্যাক এখানে দেখানো হয়েছে। আপনারা চাইলে নিয়মিত ব্যবহারের জন্য আপনাদের পছন্দমত যেকোনো একটি বা দুটি ফেস প্যাক বেছে নিতে পারেন। চলুন জেনে নেয়া যাক

ত্বকের ও চুলের যত্নে আলু কীভাবে ব্যবহার করবেন

আলু ও লেবুর রস

আলু ও লেবুর রসের প্যাক ত্বকের জন্য খুবই উপকার। এই প্যাক তৈরিতে প্রথমে ১ চা চামচ থেঁতলানো আলুর সাথে ১/২ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর মুখে লাগিয়ে রাখতে হবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এবার ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, টমেটো ও টকদই

এই পেস্টটিও ত্বকের জন্য অনেক ভাল। এটি করতে ১ চা চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ টমেটোর পেস্ট ও ১ চা চামচ টকদই একসাথে ভালো করে মিশিয়ে গলায় ও মুখে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। শুকিয়ে গেলে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, টমেটো ও দুধের সর

আমরা জানি দুধের সর ত্বকের জন্য অনেক উপকার করে থাকে। এই পেস্ট করতে ১ চা চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ টমেটোর পেস্ট ও ১/২ চা চামচ দুধের সর একসাথে মিশিয়ে গলায় ও মুখে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। এরপর ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, স্ট্রবেরি ও মধু

ত্বকের যত্নে মুধুর গুনাগুন তো অতুলনীয়। অর্ধেক আলু ও ১টা স্ট্রবেরি একসাথে পেস্ট করে নিতে হবে। এর সাথে ১/২ চা চামচ মধু মিশিয়ে মুখে ও গলায় ২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, মুলতানি মাটি ও গোলাপজল

এই প্যাকটি তৈলাক্ত ত্বকের জন্য খুবই ভালো। এই প্যাক করতে ১ টেবিল চামচ থেতলানো আলু, ১/২ চা চামচ মুলতানি মাটি ও ১ চা চামচ গোলাপজল একসাথে মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর তৈরিকৃত প্যাকটি গলায় ও মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। দেখবেন শুষ্ক ত্বক হলে এটি না লাগানোই ভালো।

আলু, টকদই ও হলুদ

রূপচর্চায় হলুদ অনেক সাহায্য করে থাকে। এই প্যাক করতে ১ চা চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ টকদই ও ১ চিমটি হলুদ মিশিয়ে ত্বকে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, কাঁচা দুধ ও আমন্ড অয়েল

এই প্যাক করতে ১ টেবিল চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ কাঁচা দুধ ও ২-৩ ফোটা আমন্ড অয়েল ভালো করে মিশিয়ে মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। তারপর শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, কাঁচা দুধ ও গ্লিসারিন

যদি আপনার কাছে আমন্ড অয়েল না থাকে তাহলে আপনি গ্লিসারিন দিয়েও প্যাকটি বানাতে পারবেন। এই প্যাক করতে ১ টেবিল চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ কাঁচা দুধ ও ২-৩ ফোটা গ্লিসারিন একসাথে মিশিয়ে মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। তারপর শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলতে হবে।

আলু, কাঁচা দুধ ও মধু

এছাড়াও এই প্যাক করতে আপনি মধু ব্যবহার করতে পারেন। মুধু অনেক ক্ষেত্রে ভালো হবে।এই প্যাক করতে ১ টেবিল চামচ থেতলানো আলু, ১ চা চামচ কাঁচা দুধ ও ১/২ চা চামচ মধু ভালো করে মিশিয়ে মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। যখন শুকিয়ে যাবে তখন ধুয়ে ফেলতে হবে। এই প্যাকটি শুষ্ক ত্বকের জন্য খুব উপকারী।

আলু ও শসা

শসার গুনাগুন সম্পর্কে কম বেশি তো সবাই জানি। সমপরিমাণ থেতলানো আলু ও থেতলানো শসা মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখতে হবে ২০ মিনিট ধরে। তারপর মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। দেখবেন মুখ ধোয়ার পর অনেক বেশি ফ্রেশ লাগবে।

আলু ও নিমপাতা

ত্বকের যত্নে আলুর ব্যবহার বলে শেষ করা যায় না। যে কোন ত্বকের জন্য ব্রন উঠা স্বাভাবিক। তবে ব্রনের সমস্যাই সবচেয়ে বেশি পড়ে থাকেন ১৭-১৮ বছরের তরুণীরা। তাই যদি আলু ও নিম পাতা একসাথে বেটে পেস্ট করে ব্রনের উপর নিয়মিত দেওয়া হয়। তাহলে ব্রন উঠা বন্ধ হয়ে যাবে।

ত্বকের যত্নে আলুর উপকারিতা

১। চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে:

আলুর রস করে সেই রস তুলায় ভিজিয়ে নিয়ে চোখের নিচে লাগিয়ে শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। নিয়মিত ব্যবহার করলে চোখের নিচের কালো দাগ দূর হবে।

২। কালো দাগদূর করতে:

ত্বকের যেখানে কালো দাগ, সেখানটায় আলুর রসের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে ১০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে নিয়মিত ব্যবহারে কালো দাগ চলে যাবে।

৩। ত্বক সজীব রাখতে:

আলুর রসে তুলা ভিজিয়ে রেখে সেই তুলা মুখ ও চোখে কিছুক্ষণ ঘষে পরে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে করে ত্বক সজীব এবং চোখের ক্লান্তি ভাব দূর হবে।

৪। বলিরেখা দূর করতে:

আলুর রসের সাথে অলিভ অয়েল মিশিয়ে চোখের নিচে ও কোনায় প্রতিদিন পাঁচ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। তারপর শুকানোর পর ধুয়ে ফেলতে হবে।এভাবে করলে ত্বকের বলিরেখা চলে যাবে।

৫। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে:

আলুর রস ও শসার রস একত্রে মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখতে হবে। পরে ধুয়ে ফেললে ত্বকের উজ্জ্বল ভাব ফুটে উঠবে।চোখের ফোলা ভাব কমাতে তুলার বল ভিজিয়ে চোখের ওপর দিয়ে রাখতে হবে।চোখের ফোলা ভাব চলে যাবে।

৬। ত্বকের শুষ্কতা কমাতে:

শুষ্ক ত্বকে অনেক সময় লোশন বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করেও শুষ্কতা কমানো যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন এক গ্লাস আলুর রস পান করতে পারেন। আলুর রস ত্বকের শুষ্কতা কমাতে অনেক সাহায্য করে।

৭। পোড়া দাগ দূর করতেঃ

পুড়ে যাওয়া ত্বকের উপর যদি আলুর রস লাগিয়ে দেন। তাহলে সেখানে অনেক প্রশান্তি পাওয়া যাবে।

৮। মুখ পরিষ্কার করতেঃ

মুখ পরিষ্কার করার জন্য প্রথমে আলুকে থেঁতো করে নিতে হবে, তারপর ভালো করে ডলে ডলে মুখে মাখতে হবে। ৪/৫ মিনিট ম্যাসাজ করার পর ধুয়ে ফেলতে হবে। ব্যাস, তারপর দেখবেন কি পরিষ্কার ঝকঝকে চেহারা পান।

৯।ঘাড়, গলা, কনুর দাগ দূর করতেঃ

কাল দাগ দূর করার জন্য আলু বাটা কিংবা আলুর রস নিতে হবে, তার সাথে কাঁচা দুধ মিক্স করতে হবে। এই মিশ্রণ ঘাড়, গলা, কনুই ইত্যাদি স্থানে লাগিয়ে রাখতে হবে। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলতে হবে। কিছুদিন ব্যবহারেই দাগ-ছোপ কমে যাবে।

 

চুলের জন্য যেভাবে ব্যববার করবেনঃ

১।চুলের যত্নে যেভাবে ব্যবহার করতে হবে, প্রথমে আলুর রস, ডিমের সাদা অংশ, ১ চা চামচ মধুর সাথে মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে রাখতে হবে ২ ঘন্টা ধরে। পরে শ্যাম্পু করে ফেলতে হবে। চুল কালো ও পাকা চুলকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে আলু সিদ্ধ করে নিতে হবে। শ্যাম্পু করার পর এই সিদ্ধ করা পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। নিয়মিত এই প্যাকটি করতে হবে। তাহলে পাকা চুল কালো হয়ে যাবে।
২।চুল পড়া কমাতে ২ চা চামচ আলুর রস, ২ চা চামচ অ্যালো-ভেরা জেল, ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে মাথার ত্বকে ও চুলে লাগাতে হবে। তারপর ২ ঘন্টা পর চুলে শ্যাম্পু করতে হবে। সপ্তাবে ২ বার প্যাকটি করলে চুল পড়া কমে যাবে।

 

চুলের যত্নে আরও কিছু টিপস

• ১০০ মিলিলিটার আলুর রসের সাথে ৫০ মিলিলিটার টমেটোর রস একসঙ্গে মিলিয়ে প্যাক বানিয়ে চুলে লাগাতে হবে। ১০ মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে। শেষে গোলাপজল দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে চুলের রুক্ষতা দূর হবে।
• ৫০ মিলিলিটার আলুর রসের সাথে ১০ মিলিলিটার নারিকেল তেল ও পাঁচ মিলিলিটার অলিভ অয়েল মিশিয়ে চুল ও মাথার তালুতে লাগাতে হবে। তারপর গরম পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে ১৫ মিনিট মাথায় পেঁচিয়ে রাখতে হবে। এবার হালকা গরম পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে আপনার চুল পড়া অনেকটা কমে যাবে।
• শ্যাম্পু করার পর পানির বদলে আলুর রস দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। তিন সপ্তাহ এভাবে আলুর রস দিয়ে চুল ধোয়ার পর দেখবেন, আপনার চুল নরম ও মসৃণ হবে।
• তিন চা চামচ আলুর রসের সাথে তিন চা চামচ অ্যালোভেরার রস মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে রাখতে হবে। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে চুলের শুষ্কতা দূর হবে সহজেই।
• চাল ধোয়া পানির সাথে আলুর রস মিশিয়ে চুলে মাখতে হবে। এই মিশ্রণ চুলের অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব দূর করতে সাহায্য করবে।

 

চুল পড়ার সমস্যা দূর করতে আলুর ব্যবহার

  • তিন চা চামচ আলুর রস, তিন চা চামচ অ্যালোভেরা রস ও এক চা চামচ মধু নিয়ে একটি প্যাক বানিয়ে ফেলতে হবে। এই প্যাকটি চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত লাগিয়ে ২ ঘণ্টা রেখে নিয়মিত শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। যদি ভালো ফলাফল চান সপ্তাহে দুই বার এই প্যাক ব্যবহার করতে হবে।
  • একটি আলু নিয়ে এটির খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে পেস্ট করতে হবে। এরপর একটি ডিম ও খানিকটা দই নিয়ে এক সাথে একটি মিহি প্যাক বানাতে হবে। এরপর এই প্যাকটি চুলের গোড়া সহ পুরো চুলে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করতে হবে। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। এটি আপনাকে সুস্থ ও ঝলমলে চুল উপহার দেবে। প্রতি ২০ দিনে এই প্যাকটি একবার ব্যবহার করলে।অনেক উপকার হবে।
  • আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলুর খোসাগুলো একটি পাত্রে নিয়ে পানি সহ জ্বাল দেন। এরপর সেই পানি একটি মগে সংরক্ষণ করে রাখুন। অতঃপর শ্যাম্পু করার পর এই পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে। এটি আপনাকে প্রাকৃতিক কালো চুল পেতে সাহায্য করবে। যাদের চুল ধূসর ধরণের তারা নিশ্চিন্তে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।তাহলে ভাল ফল পাবেন।
  • তেলের মতো করে চুলে আলুর রস লাগাত্তে পারেন। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে পারেন। এর ফলে মাথায় নতুন চুল গজাবে। মাসে অন্তত দুবার চুলে এভাবে আলুর রস মাখতে হবে। তাহলে ফলাফল আপনি পেতে পাবেন।

কিছু সতর্কতাঃ

গায়ে ছোপ দাগ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে নতুন আলু ব্যবহার করবেন না। পেটের সমস্যা থাকলে আলুর রস পান করা থেকে বিরত থাকবেন।এমনকি আলুর রসে স্বাদ বাড়ানোর জন্য এতে পুদিনা পাতা, মধু, লেবুর রস বা গাজরের রস মিশিয়ে নিবেন না এইক্ষেত্রে আলুর রস খেলে ডায়রিয়া হতে পারে। অনেক সময় আলু এর রস ব্যবহারে ত্বকে চুলকানি হতে পারে। তবে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এরকম বলে কয়েকদিন বিরতি নিয়ে আবার ব্যবহার করতে পারবেন। খেয়াল রাখবেন যে আলু ব্যবহার করছেন তা যেন তাজা হয়।

 

 

প্রিয়া সাঈদ

প্রিয়া সাঈদ একজন স্নাতক এবং হাউজওয়াইফ। বই পড়া এবং জ্ঞান অর্জন করা তার প্রধান শখ এবং সাথে সাথে তার অর্জিত জ্ঞানকে সে শেয়ার করতে পছন্দ করে। আর এজন্য বিডি টিপস অ্যান্ড ট্রিকস এ তার এই বাস্তব এবং জ্ঞানগর্ভমূলক পোস্টসমূহ। তার এই পোস্টসমূহ যদি আপনার উপকারে আসে তাহলে অবশ্যই লাইক এবং শেয়ার করবেন আশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*