Skip to main content

পাইলস বা অর্শ দূরীকরণে উপকারি খাদ্য

অর্শ বা পাইলসের সমস্যা অনেকেরিই হয়ে থাকে। পাইলসের সমস্যা বিভিন্ন কারনে হতে পারে, তার মধ্যে কোষ্ঠ্যকাঠিন্যের সমস্যা, দীর্ঘ মেয়াদী কাশির সমস্যা, প্রস্রাবে বাধা, গর্ভধারণ, মলদ্বারে ক্যানসার অথবা নিয়মিত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পাইলস হলে আপনার মলদ্বারে যন্ত্রণা, রক্ত পড়া, মলদ্বার ফুলে যাওয়া মূলত এই ধরণের উপসর্গ দেখা দিবে। তবে পাইলস এর জন্য ভীত হবার কোনো কারন নেই। পাইলসের নানা ধরণের চিকিৎসা রয়েছে। সমস্যা কতটা গভীর তার উপরও চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে। কখনও শুধু ওষুধেই কাজ দেয়, কখনও আবার সমস্যা এতটাই বেড়ে যায় যে অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। তবে পাইলসের সমস্যায় কিছু নির্দিষ্ট খাবার আছে যা অত্যন্ত উপকারী এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণরুপে আরোগ্য সম্ভাব। এরকমই কিছু খাবার এর ব্যবহার আমি আপনাদের এখন দেখাব।

র‍্যাডিশ বা মূলার জুস

মূলা আমাদের কাছে একটি অতিপরিচিত সবজি। এই সবজিটি অনেকে পছন্দ করে, আবার অনেকেই পছন্দ করে না। কিন্তু এই সবজিটি পাইলসের সমস্যায় অত্যন্ত উপকারি। এই সবজির রস খেলে পাইলসের সমস্যা থেকে উপকার পাওয়া যাবে। প্রথমে ১/৪ কাপ দিয়ে শুরু করুন। তারপর পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়িয়ে ১/২ কাপে নিয়ে আসুন।

কলা

কলা আমাদের সকলেরই পছন্দ। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা সবচেয়ে উপকারি এবং অব্যর্থ ওষুধ হল কলা। বিনা কষ্টে মলত্যাগ করতে সাহায্য করে কলা। এর ফলে মলদ্বারে কোনও চাপ পড়ে না, ফলে পাইলসের সমস্যা বৃদ্ধি হয় না।

ডুমুর

গ্রাম অঞ্চলে ডুমুর অনেক পরিচিত। শুকনো ডুমুর বা ফিগ ১ গ্লাস পানিতে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন সকালে এই অর্ধেক পানি খেয়ে নিন। আবার বিকেলের দিকে বাকি অর্ধেক পানি খেয়ে নিন। পাইলসের সমস্যায় ভাল ফলাফল পাবেন।

বেদানা

বেদানা খেতে আমাদের সকলেরই খুব পছন্দ।  এই ফলটি পাইলসের সমস্যার জন্য অনেক উপকারি।  প্রথমে বেদানার দানা পানিতে ভাল করে ফোটান। যতক্ষণ না বেদানার দানা ও পানির রং বদলায়ে না যায়, ততক্ষণ ক্রমাগত ফুটিয়ে যান। এই পানি ছেঁকে রেখে দিন। দিনে দুবার করে এই পানি পান করুন। নিশ্চয় উপকার পাবেন।

আদা ও লেবুর রস

আদা ও লেবুর রস আমাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে। আর আদা ও লেবুর রস পাইলসের সমস্যায় খুব ভাল কাজ করে থাকে। ডিহাইড্রেশনও পাইলসের অন্যতম কারণ। আদা ও লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে তাতে ১ চামচ মধু ভাল করে মিশিয়ে নিন। দিনে দুবার করে এই মিশ্রণটি খান। এতে শরীরে হাইড্রেট হবে এবং পাইলসের সমস্যাও কমবে।

প্রাতঃকর্মের সময় বসার ধরণ

অনেক সময় ভুল পদ্ধতিতে কমোডে বসার ফলে অতিরিক্ত চাপের প্রয়োজন হয়। পায়ের নিচে একটা ছোট টুল রাখুন। কমোডে বসার সময় একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসুন। এতে বৃহদন্ত্রের কম চাপ পড়বে। এতে করে পাইলসের সমস্যা কম হতে পারে।

ওয়ার্কআউট

কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা কমাতে ও শরীরে রক্তচলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত ওয়ার্ক আউট করা উচিত। তবে যদি খুব পরিশ্রম করেন বা ভার উত্তোলন করেন তাহলে পাইলসের সমস্যা বাড়তে পারে। সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো হাল্কা ওয়ার্কআউট করুন।

হলুদ

কাঁচা হলুদও পাইলসের জন্য খুবি উপকারি । কাঁচা হলুদ ভাল করে পানিতে ফোটান । আর এই পানি নিয়মিত পান করুন। এতে পাইলসের সমস্যায় অনেকটা উপকার পাওয়া যাবে।

ডাল

আমরা বাঙলীরা ডালভাত খেতে খুব পছন্দ করি। আর সকল প্রকার ডাল নিয়মিত খেলে পাইলসের সমস্যা অনেকাংশে কম হয়। ডালের মধ্য  খেতে পারেন মসুর ডাল, খেসারী ডাল ও তিসী ডাল, যা  পাইলসের সমস্যা নিরাময়ে খুবই উপকারি।

কাঁচা পেঁয়াজ

পাইলসের কারণে মলদ্বার থেকে রক্ত পড়ার যে সমস্যা তৈরি হয়, কাঁচা পেঁয়াজ সে সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। অন্ত্রের যন্ত্রণা প্রশমিত করতেও কাঁচা পেঁয়াজ সাহায্য করে।

পাইলস বা অর্শ নিরাময়ে উপরে বর্ণিত খাদ্যগুলি খুবই উপকারি। আপনার যদি পাইলসের সমস্যা থাকে, তাহলে উপরের খাদ্যগুলো নিয়ম মেনে খেলে আশা করি আপনি পাইলস থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবেন।

অর্শ বা পাইলস কেন হয় (অর্শের কারণসমূহ)

এখনও অর্শের সঠিক কারণ জানা না গেলেও নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্শ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেঃ
১. যদি দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকে।
২. শাকসব্জী ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার এবং পানি কম খাওয়া হলে।
৩. শরীরের অতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে।
৪. গর্ভাবস্থাতেও হতে পারে।
৫. লিভার সিরোসিস এর কারনেও।
৬. মল ত্যাগে বেশী চাপ দেওয়া পড়লে।
৭. অতিরিক্ত মাত্রায় লেকজেটিভ (মল নরমকারক ওষুধ)ব্যবহার করা বা এনেমা (শক্ত মল বের করার জন্য বিশেষ
তরল মিশ্রণ ব্যবহার করা) গ্রহণ করালে।
৮. টয়লেটে বেশী সময় ব্যয় করা করলে।
৯. বৃদ্ধ বয়সেও।
১০. পরিবারে কারও পাইলস থাকা হতে পারে।
১১. ভার উত্তোলন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা ইত্যাদি।

 অর্শের লক্ষণসমূহ

অর্শ বা পাইলস কিভাবে বুঝা যাবে এই নিয়ে অনেকে আবার চিন্তিত থাকে। চলুন তাহলে দেখে নেই কিভাবে অর্শ বা পাইলস হয়েছে বুঝতে পারবেন।
i) মলদ্বারের অভ্যন্তরে হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারেঃ

১. পায়খানার সময় ব্যথাহীন রক্তপাত হলে।
২. মলদ্বারের ফোলা বাইরে বের হয়ে আসতে পারে, নাও পারে। যদি বের হয় তবে তা নিজেই ভেতরে চলে যায় অথবা হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। কখনও কখনও এমনও হতে পারে যে, বাইরে বের হওয়ার পর তা আর ভেতরে প্রবেশ করানো যায় না বা ভেতরে প্রবেশ করানো গেলেও তা আবার বের হয়ে আসে।
৩. মলদ্বারে জ্বালাপোড়া, যন্ত্রণা বা চুলকানি হলে।
৪. কোন কোন ক্ষেত্রে মলদ্বারে ব্যথাও হতে পারে।

ii) মলদ্বারের বাইরে হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারেঃ

১. মলদ্বারের বাইরে ফুলে যাওয়া যা হাত দিয়ে স্পর্শ ও অনুভব করা যায়।
২. কখনও কখনও রক্তপাত বা মলদ্বারে ব্যথাও হতে পারে।

কি করব (অর্শ বা পাইলস রোগে করণীয়)

১. কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং নিয়মিত মলত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে।

২. পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসব্জী ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং পানি(প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস) পান করতে হবে।
৩. সহনীয় মাত্রার অধিক পরিশ্রম না করা।
৪. প্রতিদিন ৬-৮ ঘন্টা ঘুমানো।
৫. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।
৬. টয়লেটে অধিক সময় ব্যয় না করার চেষ্টা করতে হবে।
৭. সহজে হজম হয় এমন খাবার গ্রহণ করতে হবে।
৮. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া লেকজেটিভ বেশী গ্রহণ না করা।
৯. মল ত্যাগে বেশী চাপ না দেয়া।
১০. দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া থাকলে তার চিকিৎসা করাতে হবে।

অর্শ বা পাইলস রোগে গ্রহণীয় কিছু খাবার

শাকসবজি, ফলমূল, সব ধরণের ডাল, সালাদ, দধি, পনির, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, লেবু ও এ জাতীয় টক ফল, পাকা পেপে, বেল, আপেল, কমলা, খেজুর, ডিম, মাছ, মুরগীর মাংস, ভূসিযুক্ত (ঢেঁকি ছাঁটা) চাল ও আটা ইত্যাদি।

অর্শ বা পাইলস রোগে বর্জনীয় কিছু খাবার

খোসাহীন শস্য, গরু, খাসি ও অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবার, মসৃণ চাল, কলে ছাঁটা আটা, ময়দা, চা, কফি, চীজ, মাখন, চকোলেট, আইসক্রীম, কোমল পানীয়, সব ধরণের ভাজা খাবার যেমনঃ পরোটা, লুচি, চিপস ইত্যাদি।

অর্শ বা পাইলস রোগের চিকিৎসা

১. মলদ্বারের বাইরের অর্শ যা হাতে অনুভব করা যায় তবে ব্যথা বা রক্তপাত হয় নাঃ

Diosmin 450mg ও Heperidin 50mg এর কম্বিনেশনে তৈরি ট্যাবলেট (যা বাজারে Normanal, Hemorif, Daflon, Diohes ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়)চিকিৎসকের পরামর্শ মতো খেতে হবে।

২. মলদ্বারের ভিতরের বা বাইরের অর্শে ব্যথা হলে (রক্তপাত সহ বা ব্যতীত):

i) ১ নং এ বর্ণিত ওষুধ
ii) Sitz Bath (৮ সে.মি. উচ্চতার কুসুম গরম পানিতে ১৫ মিনিট করে বসতে হবে- প্রতিদিন প্রয়োজন অনুসারে ২-৪ বার
iii) Over-the-counter hemorrhoid ointment বা suppository দিনে ১-৩ বার (বা ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে)ব্যবহার করা, যেমনঃ
Cinchocaine Hydrochloride, Hydrocortisone, Neomycin Sulphate ও Esculin Sesquihydrate এর কম্বিনেশনে তৈরি Ointment (বাজারে Anorel, Anustat ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়)বা Suppository (বাজারে Cinoplus নামে পাওয়া যায়), অথবা
Cinchocaine HCl 5mg, Hydrocortisone 5mg, Framycetin Sulphate 10mg ও Esculin10mg এর কম্বিনেশনে তৈরি Ointment বা Suppository (বাজারে Erian নামে পাওয়া যায়)
iv) ট্যাবলেট Paracetamol ১টি করে দিনে ২/৩ বার
v) বরফের টুকরা গামছা বা অন্য কোন কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ফোলা জায়গায় লাগালেও ব্যথা উপশম হবে।

৩. মলদ্বারের ভিতরের অর্শ হতে ব্যথাহীন রক্তপাত হলে এবং/অথবা মলদ্বারের ভিতরের অর্শ যদি বাইরে বের হয়ে আসে এবং তা নিজেই ভেতরে চলে যায় অথবা হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায়ঃ
২ নং এ বর্ণিত i) এবং iii).

৪. উপরোক্ত চিকিৎসায় যদি যথেষ্ট উন্নতি না হয় তাহলে-
a) অর্শ মলদ্বারের বাইরে হলেঃ
i) অর্শ ছোট হলে- Local anesthesia ইনজেকশন দিয়ে অর্শ কেটে ফেলা হয়
ii) অর্শ বড় হলে বা তাতে রক্ত জমাট বেধে গেলে-Haemorrhoidectomy অপারেশন করা হয়।

b) অর্শ মলদ্বারের ভিতরে হলেঃ
i) যদি এমন হয় যে মলদ্বারের ভিতরের অর্শ বাইরে বের হয় না বা বের হয় তবে তা নিজেই ভেতরে চলে যায় সেক্ষেত্রে চিকিৎসা-
1. স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy) যাতে অর্শে Chemical irritants (যেমন-Oily phenol) ইনজেকশন দেয়া হয়।
2. ব্যান্ড লাইগেশন যাতে একটি চিমটার সহায়তায় অর্শকে টেনে ধরে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেয়া হয় (যদি অর্শ বাইরে বের হয়ে আসে কিন্তু নিজে নিজে ভেতরে চলে যায় না বরং হাত দিয়ে তা ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয় তাহলে সেক্ষেত্রেও কখনও কখনও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়)।
3. Infrared Photocoagulation বা Cauterization যাতে একটি electric probe বা laser beam বা infrared light অর্শে প্রয়োগ করা হয়(যদি অর্শ বাইরে বের হয়ে আসে কিন্তু নিজে নিজে ভেতরে চলে যায় না বরং হাত দিয়ে তা ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয় তাহলে সেক্ষেত্রেও কখনও কখনও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়)।

ii) যদি এমন হয় যে মলদ্বারের ভিতরের অর্শ বাইরে বের হয়ে আসে এবং বের হওয়ার পর তা আর ভেতরে প্রবেশ করানো যায় না বা হাত দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো গেলেও পরে তা আবার বের হয়ে আসে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসা-
Surgery বা অপারেশন:
১. পুরনো পদ্ধতিতে অর্শ অপারেশন
২. Longo বা Stapled Haemorrhoidectomy যাতে অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে মলদ্বার না কেটে অর্শ অপারেশন করা হয়
৩. ডায়াথারমি পদ্ধতিতে অর্শ অপারেশন।

এই সকল ওষধু অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে খেতে হবে আমি এখানে আপনাদের জানার জন্য দিয়ে দিয়েছি।

 

প্রিয়া সাঈদ

প্রিয়া সাঈদ একজন স্নাতক এবং হাউজওয়াইফ। বই পড়া এবং জ্ঞান অর্জন করা তার প্রধান শখ এবং সাথে সাথে তার অর্জিত জ্ঞানকে সে শেয়ার করতে পছন্দ করে। আর এজন্য বিডি টিপস অ্যান্ড ট্রিকস এ তার এই বাস্তব এবং জ্ঞানগর্ভমূলক পোস্টসমূহ। তার এই পোস্টসমূহ যদি আপনার উপকারে আসে তাহলে অবশ্যই লাইক এবং শেয়ার করবেন আশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*